
রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ২৫ দিন পর কিলিং স্কোয়াডের আসামি গ্রেপ্তার এবং হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে বলে দাবি করেছেন এবিপিএন। শনিবার (২৩ অক্টোবর) বেলা ১১টায় এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন উখিয়ার ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মো. নাঈমুল হক।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ
হত্যাকাণ্ডের কিলিং স্কোয়াডের আসামি গ্রেপ্তার এবং হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন হয়েছে।
এ ব্যাপারে উখিয়ার ১৪ এপিবিএনের কার্যালয়ে দুপুর ১টায় সংবাদ সম্মেলন করা হবে। সংবাদ
সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
এর আগে উখিয়ার ক্যাম্পে গত ২৯ সেপ্টেম্বর
রাতে নিজের এ অফিসেই তিনি দলবদ্ধ দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন। ৪৮ বছর বয়সী মুহিবুল্লাহ
গঠন করেছিলেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস
(এআরএসপিএইচ)’ নামের একটি সংগঠন। যেটির চেয়ারম্যানও করা হয় তাকে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন বাঁধা
রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যার পর জোরদার
করা হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পের। সার্বক্ষণিক টহল জোরদার
করার পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে এপিবিএন ও পুলিশ সদস্য। চলছে যৌথ অভিযান। মুহিবুল্লাহর
অফিস কক্ষটি হলুদ টেপ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আর্মড পুলিশের সদস্যরা পাহারা দিচ্ছে।
ক্যাম্পের ভেতরেই একটি কবরস্থানে রোহিঙ্গাদের এ নেতা মুহিবুল্লাকে দাফন করা হয়েছে।
প্রতিদিনই অন্য ক্যাম্পের রোহিঙ্গারাও সেখানে ভিড় জমান।
কবরস্থানের উল্টো দিকেই ছোট্ট একটি বাক্স বসিয়ে পান-সিগারেট বিক্রি করছিলেন তরুণ আনসারউল্লাহ। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা শুনে আসছেন সবাইকে নিয়ে দেশে ফিরবেন মুহিবুল্লাহ। তার মৃত্যুর পর সেই সম্ভাবনা মিইয়ে গেল কি না- তা নিয়ে তরুণদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আনসারউল্লাহর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই অন্তত ২৫-৩০ জনের ভিড় জমে যায়। এর মধ্যেই মুহিবুল্লাহর কথা শুনে কেঁদে ওঠেন অনেকেই।
মুহিবুল্লাহ সবাইকে নিয়ে দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন
জানিয়ে নূরউদ্দীন বলেন, ‘সে বলেছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে
আলোচনা করছেন। দেশেও অনেকের সঙ্গে মুহিবুল্লাহদের আলোচনা হচ্ছিল। সে বলেছিল, আমাদের
এখানে পড়ে থাকতে হবে না।’
কবরস্থানের পাশে ভিড়ের মধ্যে ছিলেন অন্য
একটি ক্যাম্প থেকে আসা মো. ইউসুফ ও মো. শফি। পঞ্চাশোর্ধ্ব শফি বললেন, ‘মুহিবল্লাহ ভাইয়ের
কথা বলতে গেলে আমার বুক ফেটে যায়।’
মুহিবুল্লাহর ঘর থেকে একটু দুরেই জাহেদা
বেগমের ঘর। সেই রাতে গুলির শব্দ শুনেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘মুহিবুল্লাহ ভাইকে
সবাই পছন্দ করত। তার জন্য অনেকে কান্নাকাটি করছে। ক্যাম্পের ভেতরে ঘরে ঢুকে কেউ তাকে
মারবে এটা ভাবতেও পারিনি।’
সেই রাতের ঘটনা
রাতের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো যে অনেকটাই
‘অরক্ষিত’ থাকে, সে আলোচনা
পুরনো। বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাতে অস্ত্রধারীদের আনাগোনা এখন তাদের চোখে ‘সয়ে গেছে’।
মুহিবুল্লাহর মেঝ ভাই হাবিবুল্লাহ বলেন,
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনা বাহিনীর নির্যাতনের কারণে প্রাণ বাঁচাতে মুহিবুল্লাহসহ
আমাদের ৩ ভাই পরিবার নিয়ে পালিয়ে উখিয়ায় চলে আসি। মুহিবুল্লাহ পরিবারে রয়েছে স্ত্রী
ও ৯ সন্তান। যার মধ্যে মেয়ে রয়েছে ৫ জন ও ছেলে রয়েছে ৪ জন। উখিয়ায় ক্যাম্পে বসবাসের
শুরু থেকেই ক্যাম্পে সবার সঙ্গে কথাবার্তা ও চলাফেরা করত।
এ ছাড়া বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে আসা
জাতিসংঘ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের নেতা ও বাংলাদেশে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের
অধিকার নিয়ে কথা বলত মুহিবুল্লাহ। সবার পক্ষে হয়ে কথা বলার কারণে সবাই মুহিবুল্লাহকে
নেতা বলে মেনে নিয়েছিল। আর নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বিশ্বের সঙ্গেও
কথাবার্তা বলছিল। রোহিঙ্গাদের নেতা হওয়া ও মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার জন্য কথা বলায়
আমার ভাইয়ের জীবন গেল।
হাবিবুল্লাহ বলেন, বুধবার রাত সাড়ে ৮টার
দিকে শার্ট-প্যান্ট, মুখে মাস্ক পরে ও হাতে অস্ত্র নিয়ে ১০-২০ জন অফিসে ঢুকেই গুলি
করে পালিয়ে যায়। যারা গুলি করেছে তাদের অনেকই চিনেছি। যারা গুলি করেছে তারা রোহিঙ্গা।
তাদের মধ্যে কয়েকজনের মুখচেনা আর কয়েকজনকে চেনা যায়নি। তবে সবাই ক্যাম্পের বিভিন্ন
ব্লকের বাসিন্দা, দিনে তারা সবাই ক্যাম্পে ঘোরাফেরা করে।
মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই আহম্মদ উল্লাহ বলেন,
মুহিবুল্লাহ ভাই বাড়ির কাছেই অফিসে ছিল। দাঁড়িয়ে কথা বলছিল সবাই। গুলির পর ভাই মাটিতে
পড়ে যায়, তখন সবাই দৌড়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়। মুহিবুল্লাহ ভাইয়ের গার্ডরাও পালিয়ে
যায়। তারপর আমরা গিয়ে মুহিবুল্লাহ ভাইকে মাটি থেকে তুলে প্রথমে ব্লকের হাসপাতালে
নিয়ে যায়। সেখানে থেকে পরে এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মুহিবুল্লাহ ভাইয়ের গায়ে গুলি লেগেছে ৩টি। বুকে ২টি ও হাতের বাহুতে একটি।
আহম্মদ উল্লাহ আরও বলেন, যারা গুলি মেরেছে
তাদের কয়েকজনকে চিনেছি। তারা মোট ১০ থেকে ২০ জন ছিল। প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ
সরকারের সঙ্গে কাজ করছিল ভাই। তাই তাকে মারা হয়েছে।
হত্যা ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫, ইলিয়াছের স্বীকারোক্তিমূলক
জবানবন্দি
কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে
গুলি করে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মোহাম্মদ ইলিয়াছ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
দিয়েছেন। রোববার (১০ অক্টোবর) কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান,
আগের দিন বিকেলে কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হেলাল উদ্দিনের আদালতে
১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইলিয়াছ। ইলিয়াছ (৩৫) উখিয়ার কুতুপালং
৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রজক আলীর ছেলে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে
নিজ সংগঠনের কার্যালয়ে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ
মুহিবুল্লাহ ওরফে মাস্টার মুহিবুল্লাহ।
এ ঘটনায় পরদিন নিহত মুহিবুল্লাহর ছোট
ভাই মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
এ পর্যন্ত ঘটনায় জড়িত সন্দেহে রোহিঙ্গা নাগরিক মোহাম্মদ ইলিয়াছসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার
করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা
নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে প্রত্যেককে
তিন দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আসামিদের মধ্যে
তিনজনকে শনিবার আদালতে আনা হয়। তাদের মধ্যে ইলিয়াছ আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে সন্ধ্যায়
ইলিয়াছসহ বাকি আসামিদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে গত রোববার (৩
অক্টোবর) দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে-৫ এ অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গা নাগরিক
মোহাম্মদ ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করে এপিবিএন।
এ ছাড়া (০১ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার কুতুপালং
ক্যাম্প-৬ থেকে মুহিবুল্লাহ হত্যায় জড়িত সন্দেহে মোহাম্মদ সেলিমকে (৩৩) ১৪ আর্মড
পুলিশ ব্যাটালিয়ানের (এপিবিএন) সদস্যরা গ্রেপ্তার করে উখিয়া থানায় হস্তান্তর করে।
এর আগে (০২ অক্টোবর) কুতুপালং রোহিঙ্গা
ক্যাম্প থেকে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে জিয়াউর রহমান ও আব্দুস সালামকে
গ্রেপ্তার করে ১৪ এপিবিএন। ওই দিন বিকেলে উখিয়া থানা পুলিশ শওকত উল্লাহ (২৩) নামে
আরেকজনকে কুতুপালং ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

