
জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় বিপ্লবের যে ডাক দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন হলে
স্বাধীনতার ১০ বছরে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতো বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা।
শুক্রবার (১৮
মার্চ) বিকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০২তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয়
শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনায় সভাপতির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী
একথা বলেন।
গণভবন থেকে
তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে
অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
জাতির পিতাকে
স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের যে কর্মসূচি জাতির পিতা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতা
বিকেন্দ্রীকরণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে পরিকল্পনা, সেটা যদি তিনি বাস্তবায়ন করে
যেতে পারতেন— তাহলে স্বাধীনতার মাত্র ১০ বছরে বাংলাদেশ একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে
প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারতো। দুর্ভাগ্য, সেই সুযোগটা তাঁকে দেওয়া হলো না।’
‘জয় বাংলা' জাতীয় স্লোগান ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে সরকার প্রধান বলেন, ‘জয় বাংলা স্লোগান একসময় নিষিদ্ধ
ছিল। এই জয় বাংলা স্লোগান দিতে গিয়ে, ৭ই মার্চের ভাষণ বাজাতে গিয়ে আমাদের কত কর্মী
জীবন দিয়েছে। আজকে সেই জয় বাংলা স্লোগান আবার ফিরে এসেছে। যে স্লোগান দিয়ে লাখো
শহীদ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এই
স্লোগান নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এখনও যারা এই স্লোগানটা দেয় না, তারা দেশের স্বাধীনতায়
বিশ্বাস করে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার
আদর্শে বিশ্বাস করে না।’
নেতাকর্মীদের
উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়
বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবো— এটাই হোক আজকের প্রত্যয়।’
প্রধানমন্ত্রী
শিশুদেরকে দেশের প্রকৃত ইতিহাস শেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘যাতে কোনও হায়েনার গোষ্ঠী বাঙালির
অর্জনগুলো আবারও ছিনিয়ে নিতে না পারে।’
তিনি বলেন,
‘এ জন্য
দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, ‘আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদেরকে ইতিহাসটা শেখাতে হবে।’ তিনি বলেন,‘২১ ফ্রেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা দিবস,
বাংলা ভাষার জন্য এদেশের মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে গেছে। যে দিবসটা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা
দিবস। এটা কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশুদের
জানতে হবে এবং শেখাতে হবে।’
শেখ হাসিনা
বলেন, ‘২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। এই বিজয়
এবং স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে যে আত্মত্যাগ, সেই আত্মত্যাগ সম্পর্কেও সবাইকে জানতে হবে।
তাহলেই তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে।’
জাতির পিতার
জন্মদিন ১৭ মার্চ এবং জাতীয় শিশু দিবসসহ প্রত্যেকটি জাতীয় দিবস সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে
দীক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বলবো, আমাদের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নিতে হবে— ছেলেমেয়ে-সহ সবাই যেন প্রজন্মের
পর প্রজন্ম এই সত্যগুলো জানতে পারে। কারণ ২১টি বছরতো সবকিছুই নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সত্যকে
কেউ মুছে ফেলতে পারে না। আজকে সেটাই প্রমাণ হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, ‘আবার যেন কখনও কোনও হায়েনার দল বাঙালির যে অর্জন, সেগুলোকে যেন কেড়ে
নিতে না পারে। তার জন্য দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নের এই গতিধারাটা অব্যাহত রাখতে
হবে। আর এই উন্নয়নের প্রত্যেকটি ধারার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করেই তাদের জন্য
কাজ করে যেতে হবে।’
আওয়ামী লীগের
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ
সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, দলের কেন্দ্রিয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক
অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলি আলোচনা
সভায় বক্তৃতা করেন।
দলের সাংগঠনিক
সম্পাদক মীর্জা আজম, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আলী খানও বক্তৃতা
করেন এবং গণভবন থেকে দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ অনুষ্ঠানটি
সঞ্চালনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, ‘বাংলাদেশের যে দারিদ্রের হার ছিল ৪০ ভাগেরও ওপরে, তাকে আমরা এখন ২০ ভাগে
নামিয়ে এনেছি।’ সেনসাস রিপোর্ট বের হলে এই সংখ্যা আরও কমে আসবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ
করেন।
তার সরকার জনগণের
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমর্থ হওয়ার পরপরই পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ
নিয়েছে। তাই আজকের দিনে সবার কাছেই তিনি নিজ পরিমণ্ডলে কিছু না কিছু উৎপাদন করার আহ্বান
জানান।
প্রধানমন্ত্রী
বলেন, ‘এই বার্তাটা শুধু আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছেই
নয়, আওয়ামী লীগের মাধ্যমে সমগ্র দেশের কাছে। দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদী না থাকে।
যার যেখানে যতটুকু সুযোগ আছে এবং যে যেখানে যতটুকু পারেন উৎপাদন করবেন। অর্থাৎ কারও
কাছে ভিক্ষা চেয়ে বাংলাদেশের মানুষ চলবে না, কারণ জাতির পিতা বলেছিলেন ‘ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না।’
তিনি বলেন,
‘আমাদের
যে মাটি আছে এবং মানুষ আছে— তাই দিয়েই আমরা নিজেদের দেশকে গড়ে তুলবো’, এটাই ছিল জাতির পিতার যুদ্ধবিধ্বস্ত
দেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার। আর তাই ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ
করে আমরা দেখিয়েছি— আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং আমরা চেষ্টা করলেই পারি। কিন্তু সেটাও
আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।’
সরকার প্রধান
ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘গৃহহীনকে ঘর করে দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে ’৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০
লাখ ঘর বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। আরও দেড় লাখ ঘর তৈরির পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ৫০
হাজার ঘর তৈরি করা হচ্ছে। এ জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ফান্ডে ৫
কোটি টাকা দিয়ে একটি ফান্ড করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক
মালিকরা অনেকে অনুদান দিয়েছেন, যেখান থেকে ২ কাঠা জমিসহ বিনে পয়সায় ঘর করে দেওয়া হচ্ছে।’ সেক্ষেত্রে তিনি আওয়ামী লীগ এবং
সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন,
‘প্রত্যেকের
এলাকাতেই এ ধরনের ঘর তৈরি হচ্ছে। এই করোনা ভাইরাসের সময় যেমন প্রণোদনা দিয়েছি, পাশাপাশি
এই ঘরগুলো নির্মাণ কাজে যারা সম্পৃক্ত, সেখানেও একটা আর্থিক স্বচ্ছলতা মানুষ পেয়েছে।
কাজেই সেখানেও আপনাদের কিন্তু একটা দায়িত্ব রয়েছে।’
শেখ হাসিনা
বলেন, ‘এদেশের প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা এবং গৃহহীনদের-দরিদ্র মানুষের পাশে থাকার
জন্যও আপনাদের স্ব স্ব অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতির পিতার আদর্শ ধারণ
করে সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টা আপনাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে।’
মাঠ পর্যায়ে
কমিউনিটি ক্লিনিক করে দিয়ে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা সম্প্রসারণে
তার সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা যেমনটি চেয়েছিলেন, তেমনটি
করার জন্যই আমরা একে একে সব পদক্ষেপ নিয়েছি।’

