Logo
শিরোনাম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি কম কেন?

প্রকাশিত:বুধবার ২২ জুন ২০২২ | হালনাগাদ:রবিবার ২৬ নভেম্বর ২০২৩ | ১০৮৫জন দেখেছেন
নিউজ পোস্ট ডেস্ক

Image

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনগণের তোপের মুখে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা বারবার বোঝাতে চাচ্ছেন, ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা একটি বৈশ্বিক বিষয়। আমেরিকায় ১৯৮১ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ডের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ জুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, বিশ্বের প্রতিটি দেশই ব্যাপক মূল্যস্ফীতিতে ভুক্তভোগী। এক বছর আগের তুলনায় গত মে মাসে দেশটিতে ভোগ্যপণ্যে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি সত্য যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর জ্বালানি, সার, শস্যসহ নানা পণ্যের দাম সারা বিশ্বেই বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবখানে যে এটি ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে, তা সত্য নয়।

বিশ্বের ৪২টি বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে আটটিতে এখনো মূল্যস্ফীতির হার চার শতাংশের নিচে। ওই আটটির মধ্যে ছয়টিই পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত। এ অঞ্চলে মূল্য স্থিতিশীলতার আরও কিছু চমৎকার উদাহরণ রয়েছে; যেমন- ভিয়েতনাম (আগের বছরের তুলনায় গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশ) এবং ম্যাকাও (গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় এ বছর একই সময়ে মূল্যবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ১ শতাংশ)। কিন্তু প্রাচ্যে এমন ব্যতিক্রম পরিস্থিতির কারণ কী? এটি ব্যাখ্যা করতে গেলে মূলত দুটি রোগ বিস্তারের কথা বলতে হয়।

২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফ্রিকান সোয়াইন জ্বরের প্রাদুর্ভাব চীনে শূকরের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। ওই সময় দেশটিতে আনুমানিক ২০ কোটি শূকর হত্যা করা হয়েছিল, যার প্রভাবে পূর্ব এশিয়ায় শূকরের মাংসের দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। তবে কিছুদিন পরেই এর দাম দ্রুত কমতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের মূল ভূখণ্ডে শুকরের মাংসের দাম গত বছরের তুলনায় এ বছরের মে মাসে ২১ শতাংশেরও বেশি কমতে দেখা গেছে। এটি তাদের অর্থনীতিতে অন্য খাতের মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সাহায্য করেছে। তাছাড়া, পূর্ব এশিয়ার মানুষ গমের চেয়ে চাল বেশি খায়- এটিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গমের দাম যেখানে ১৭ শতাংশ বেড়েছে, সেই তুলনায় চালের দাম বেড়েছে আট শতাংশের মতো।

এই অঞ্চলে স্বল্প মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পর্ক থাকা দ্বিতীয় রোগ হলো কোভিড-১৯। পশ্চিমাদের তুলনায় এশিয়ার অনেক দেশ তুলনামূলক ধীরগতিতে ভাইরাসের উপস্থিতি মেনে জীবনযাপন শুরু করেছে। যেমন- ইন্দোনেশিয়ায় গত ২২ মার্চ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য কোয়ারেন্টাইন বিধি বলবৎ ছিল। মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ ও চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে কেবল মে মাসের শুরুর দিকে। তাইওয়ান করোনার বিষয়ে এখনো সতর্ক। আর চীন তো যেখানেই সংক্রমণ দেখা যায়, সেখানে মানুষের চলাচল ও জমায়েতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে চলেছে। সাংহাইসহ একাধিক চীনা শহরে জারি করা সাম্প্রতিক লকডাউন পণ্যের সরবরাহ ও সেগুলো কেনায় ভোক্তাদের ইচ্ছা উভয়কেই বাধাগ্রস্ত করেছে। সরবরাহ ও চাহিদার এই জোড়া বাধা তাত্ত্বিকভাবে পণ্যের দামকে যেকোনো দিকে প্রবাহিত করতে পারে। তবে ভোক্তাব্যয়ের ক্ষতি আরও গুরুতর ও স্থায়ী বলে মনে হচ্ছে। গত মে মাসে সাংহাইয়ে লকডাউনের দ্বিতীয় মাসে এক বছর আগের তুলনায় খুচরা পণ্য বিক্রি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণে বিধিনিষেধ হংকং এবং ম্যাকাওয়ের অর্থনীতির জন্য ধ্বংসাত্মক হয়েছে। ক্যাসিনোনির্ভর ম্যাকাওয়ের জিডিপি ২০১৯ সালের প্রথম তিন মাসে যা ছিল, এ বছরের একই সময়ে তার অর্ধেকেরও নিচে দাঁড়িয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এক শতাংশ মূল্যস্ফীতি খুব একটা অলৌকিক মনে হয় না। পশ্চিমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অনেক নীতিনির্ধারককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। যেমন- আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক গত ১৫ জুন সুদের হার ০.৭৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, যা পরিকল্পিত সময়ের চেয়েও দ্রুত। মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ফেডারেল ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। আমেরিকায় সুদের উচ্চহার বিশ্বব্যাপী মূলধন প্রবাহকে আকর্ষণ করছে এবং তাতে এশীয় মুদ্রার ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

হংকং ও ম্যাকাও আমেরিকায় বাড়ার পরের দিনই সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। মালয়েশিয়া-তাইওয়ানও এরই মধ্যে সুদের হার বাড়িয়েছে এবং ইন্দোনেশিয়া আগামী মাসে বাড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির ধারা ঠেকাতে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছে, তা হলো রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা। ইন্দোনেশিয়া সাময়িকভাবে পাম তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছিল এবং মালয়েশিয়া জ্যান্ত মুরগি রপ্তানিতে এখনো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। উৎপাদনের পুরোটা নিজস্ব জনগণের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করাই তাদের লক্ষ্য।

কিন্তু কম দাম স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদন কমাতে প্ররোচিত করলে এসব নীতির বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা এ অঞ্চলের অন্যত্র মূল্যস্ফীতিও বাড়িয়ে দেয়; যেমন- সিঙ্গাপুর। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ছোট দেশটি পোল্ট্রি আমদানিতে প্রতিবেশী মালয়েশিয়ার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অর্থাৎ এদের একজনের সিদ্ধান্ত অন্যজনের সমস্যা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিউজ ট্যাগ: মূল্যস্ফীতি

আরও খবর