
বলিউডের জন্য বছরটা ভালো যাচ্ছে না। দুই বছরের মহামারীকাল, একাধিক লকডাউনের পর দর্শককে সিনেমায় ফেরানো ছিল কঠিন। সেক্ষেত্রে বেগ পেতে হয়েছে হলিউডকেও। কিন্তু বলিউড ফিরতে পারছে না কিছুতেই। দ্রুতই বদলে গিয়েছে দর্শকের রুচি। ওটিটির উত্থানের কারণে ভিন্ন ধারার কনটেন্ট ও দীর্ঘ লকডাউনে বৈশ্বিক সিনেমার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে বহু দর্শক। এর বাইরে দর্শকের একটি বড় অংশ বিনোদন ধারার সিনেমার প্রতি ঝুঁকেছে। গত দুই বছরে অ্যাকশননির্ভর সিনেমার জনপ্রিয়তা এর প্রমাণ। এক্ষেত্রে এগিয়ে দক্ষিণ ভারতের সিনেমা। পাশাপাশি আরেকটি ধারায় গল্পনির্ভর সিনেমারও দর্শক রয়েছে। সেক্ষেত্রেও এগিয়ে দক্ষিণ ভারত ও কিছু ক্ষেত্রে বলিউডের মূলধারার বাইরের সিনেমা। কিন্তু বাণিজ্যিক ধারার বলিউড সিনেমা দর্শক টানতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বয়কট সংস্কৃতি।
এ বছর টুইটার ‘বয়কট বলিউড’ হ্যাশট্যাগে ভরে গিয়েছে। শুরুটা হয়েছিল নেপোটিজম নিয়ে। কাছাকাছি সময়ে সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু ও আরো কিছু বিষয়ের কারণে বলিউড থেকে দর্শক মুখ ফেরাতে শুরু করছে। কিন্তু যেসব কারণ দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে সেসব কারণে এমন বয়কট আন্দোলন অনেকটাই ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ সদৃশ বলে মনে করেন সিনেমার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। কেননা সিনেমার সঙ্গে কেবল নায়ক-নায়িকা তথা স্টাররাই থাকেন না, সিনেমার সঙ্গে বহু কলাকুশলীর জীবিকা জড়িত। বয়কটের মাধ্যমে সিনেমার ব্যবসা কমিয়ে দিলে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মূলত, বয়কটে সার্বিকভাবে সিনেমা ও অর্থনীতির ক্ষতি হয় এ কথা বলছেন সিনেমাসংশ্লিষ্টরাই এবং আশ্চর্যের বিষয় এ বয়কটের ক্ষেত্রে অনেক সময় দর্শক অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে না। বয়কট নিয়ে বলিউডে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। নানা সময়ে তারকা, পরিচালক ও অন্যদের বক্তব্যে তা প্রকাশ পায়। দোষারোপ, পাল্টা উত্তরও আসছে। যেমন কিছুদিন আগে যশ রাজ ফিল্মসের সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনুরাগ কাশ্যপ আদিত্য চোপড়াকে দোষারোপ করেছিলেন। তার মতে, যশ রাজ ফিল্মসের বর্তমান প্রযোজক জীবনঘনিষ্ঠ নন বলে এ অবস্থা হয়েছে। এর প্রত্যুত্তরে অনুপম খের বলেন, আমি আদিত্য চোপড়ার কাজে গর্বিত। তারা বহুদিন ধরে যেভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিয়েছেন তা সহজ নয়। বরং নিজের ইচ্ছামতো কোনো একটা মন্তব্য করা সহজ।
বয়কটের বিষয়টিকে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী উদ্দেশ্যমূলক মনে করেন। তাদের ধারণা একটি গোষ্ঠী কাজটি করছে। যেমন স্বরা ভাস্করের মতে, এটাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। গুটিকয় মানুষ তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য বলিউডকে বয়কট করছে। তারা বলিউডকে ঘৃণা করে। নিজেদের স্বার্থের জন্য তারা একটা এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বরা বরাবরই রাখঢাক না রেখে সোজা কথা বলায় বিশ্বাসী। ইটের বিপরীতে পাটকেল দিয়ে জবাব দেন তিনি। তবে অনেকে সহজভাবে নিচ্ছেন বিষয়টি। তাদের বক্তব্য হলো গুটিকয় মানুষের বয়কটে ভালো সিনেমার কোনো ক্ষতি হয় না। ফিল্মফেয়ারের রেড কার্পেটে জাভেদ আখতারকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, এটা একটা সাময়িক বিষয়। বয়কট খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। সিনেমা ভালো হলে দর্শক এর প্রশংসা করবে। সিনেমাটি ভালো ব্যবসা করবে। সিনেমা ভালো না হলে তো তা হবে না। বাতিল বা বয়কটের কারণে ভালো সিনেমা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে আমি মনে করি না।
কিন্তু কোনটা ভালো সিনেমা আর কোনটা খারাপ তার মানদণ্ড তো আসলে নেই। বক্স অফিসের ক্ষেত্রে দর্শকের ভালো লাগাই বড় বিষয়। সেক্ষেত্রে বয়কট বা নেতিবাচক প্রচার কিছুটা হলেও কাজ করে। অনেক সম্ভাবনাময় সিনেমাও হোঁচট খায়। স্টার পাওয়ারও কাজ করে না। যেমন লাল সিং চাড্ডা। আবার অনেকে মনে করেন এখন দক্ষিণ ভারতের স্টার বা সিনেমা হলেই তা হিট করবে। সব ক্ষেত্রে এ কথা সত্য নয়। ‘লাইগার’ দিয়ে বলিউডে অভিষেক হলো দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় দেবরকোন্ডার। কিন্তু অনন্যা পান্ডের সঙ্গে অভিনীত এ সিনেমাও বয়কটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সরাসরি বয়কট না করলেও সিনেমার বেশির ভাগ রিভিউ নেগেটিভ। বিজয় দেবরকোন্ডা এ বয়কট নিয়ে বলেছিলেন, ‘বয়কটে সিনেমার সঙ্গে জড়িত পুরো অর্থনীতিরই ক্ষতি হয়।’ সম্প্রতি আশির দশকের অভিনেত্রী মন্দাকিনি এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সিনেমার সঙ্গে যুক্ত টেকনিশিয়ানদের আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেন।
কিন্তু এ কথা মানতে নারাজ পল্লবী জোশী। দ্য কাশ্মীর ফাইলসে তিনি ছিলেন অভিনেত্রী ও প্রযোজক। তার মতে, কোনো অবস্থাতেই আসলে সিনেমা নির্মাণ বন্ধ হবে না। আর সিনেমা নির্মাণের পর পরই সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ক্রু, টেকনিশিয়ানদের পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। মুক্তির পর কেবল প্রযোজকের লাভ ক্ষতি নির্ধারিত হয়। কিন্তু পল্লবীর কথার সঙ্গে বাস্তবের একটু ফাঁক আছে। অনেক সময়ই সিনেমা ফ্লপ হলে স্টাররা পারিশ্রমিক নেন না বা ফেরত দেন। বয়কট বেশিদিন চললে সিনেমা নির্মাণ বন্ধ না হলেও কমে যাবে বা পারিশ্রমিক কমাতে বাধ্য হবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো। বয়কটের বহু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু রাজনৈতিক, কিছু সাম্প্রদায়িক আর কিছু কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা। বেশির ভাগ অভিনেতা, পরিচালক দর্শককে রাগাতে না চাইলেও বিজয় বর্মা মনে করেন এখন একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছে বিষয়টা। ১০ বছর আগের বক্তব্য টেনেও সিনেমা বা অভিনেতাকে বয়কট করা হচ্ছে। এটা নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে এর বাইরেও অন্যভাবে ভাবা যায়। যেমন সুনীল শেঠি মনে করেন, ‘এখনকার সিনেমার গল্প বা উপস্থাপনা হয়তো দর্শকের পছন্দ হচ্ছে না। এগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।’ আসলে পুরো ব্যাপারটা নিয়েই নতুন করে ভাবা প্রয়োজন। কেননা ট্রেন্ড চলতে থাকলে বাস্তবে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি বাড়বে বৈ কমবে না।

